মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে জিম্মি সবজি চাষিরা

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে জিম্মি সবজি চাষিরা

লক্ষণ বর্মন, নরসিংদী ৩:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০১, ২০১৭

print
মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে জিম্মি সবজি চাষিরা

বাজারে আসতে শুরু করেছে শীতের সবজি। সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত সেই নরসিংদীতে ফলন ভাল হলেও এখানকার কৃষকরা খুব ভাল নেই। মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে জিম্মি হয়ে ক্রমেই সবজি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন চাষিরা।

.

সারা দেশের চাহিদার ৪০ শতাংশ সবজির রফতানি হয়ে থাকে নরসিংদীর শিবপুর, জঙ্গলী শিবপুর, নারায়ণপুর, যোশর, সৃষ্টিগড় কোন্দারপাড়া, রায়পুরা এলাকা থেকে।

সবজি চাষের এই ভরা মৌসুমে আশানুরুপ মূল্যে সবজি বিক্রি করতে না পেরে লোকসান গুণতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে কৃষকদের লোকসান কমাতে ক্ষেত থেকে আইএফএমসি প্রকল্পের মাধ্যমে সবজি রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. লতাফত হোসেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নরসিংদীর মাটি পুষ্টি গুণে ভরপুর হওয়ায় এবার জেলায় সবজির অভাবনীয় ফলন হয়েছে। উৎপাদন ছাড়িয়ে গেছে লক্ষ মাত্রার চেয়েও বেশি।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবার রবি শস্য মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ২ হাজার হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে। লাউ আবাদ হয়েছে ৯৫০ হেক্টর জমিতে, বেগুন আবাদ হয়েছে ২ হাজার হেক্টর জমিতে, ফুলকপি আবাদ হয়েছে ১ হাজার হেক্টর জমিতে, বাঁধাকপি আবাদ হয়েছে ১৫০০ হেক্টর জমিতে, টমেটো আবাধ হয়েছে ৪৫০ হেক্টর জমিতে, উচ্ছে আবাদ হয়েছে ৪৫০ হেক্টর ও মিষ্টি কুমড়া আবাদ হয়েছে ২৫০ হেক্টর জমিতে।

উৎপাদন ভালো হলেও ভালো নেই এ অঞ্চলের কৃষকরা। বেলাব উপজেলার চরউজিলাব ইউনিয়নের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বারৈচা বাসস্ট্যান্ডের পাশে বারৈচা পাইকারী সবজি বাজার।

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় বিভিন্ন এলাকার সবজি চাষিদের সঙ্গে। তারা জানান, সপ্তাহের তিন দিন সোম, বুধ ও শুক্রবার হাট বসে। হাটে চাষিরা চাষ করা সিম, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডাটা শাক, মরিচ, লাউ, চাল কুমড়া, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি নিয়ে আসেন। হাটের দিন বিভিন্ন শাক-সবজি ট্রাক ভর্তি করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।

তাদের মধ্যে বিটিমরজাল গ্রামের সবজি চাষি আবুল কালাম এক বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকারও বেশি। দাম উঠেছে অর্ধেক। তিনি বলেন, বেশি দামে সার ও কীটনাশক কিনে জমিতে দিতে হয়েছে। মৌসুমের শুরু হলেও বাজারে আসলে পাইকাররা একজোট হয়ে দাম বলে বসে থাকে। কেউ দাম বাড়াতে চায় না। সবাই মিলে বাজার দখল করে রেখেছে।

ধুকুন্দী গ্রামের সবজি চাষি আলমগীর হোসেন বলেন, সার ও কীটনাশকের দাম আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু বাজারে দাম ঠিকমত পাই না।

সবজি চাষি নিরঞ্জন বলেন, এই ভাবে গায়ে খেটে আর চড়া দামে কীটনাশক কিনে তরকারি বিক্রি করতে হলে পুঁজি সব লাটে উঠছে।

শুধু বারৈচা নয়, জেলার শিবপুর, জঙ্গী শিবপুর, নারায়ণপুর, যোশর, সৃষ্টিগড় কোন্দারপাড়া সবজির হাট ঘুরে সবজি চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের একই সমস্যা। বাজারে সবজি নিয়ে আসলে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

সরেজমিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেলাব উপজেলার বারৈচা পাইকারী সবজি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাটের দিন আশেপাশের গ্রাম থেকে শতশত সবজি চাষি ভ্যান ও রিকশায় ঝুড়ি ভর্তি করে করলা, বিভিন্ন প্রকারের সবজি নিয়ে ভিড় জমিয়েছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাজারের গন্ডি ছাড়িয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ক্রেতা ও বিক্রেতারা সবজি কেনাবেচার দরদাম হাকছে। পাইকারী ক্রেতারা হাজার হাজার মণ সবজি কিনে মহাসড়কের পাশে রাখা ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে তুলছেন।

সবজি চাষি আব্দুল মান্নান, কাজল মিয়া ও সাদেক মিয়া জানান, পাইকারী ক্রেতারা স্থানীয় দালালদের সাথে হাট বসার আগেই আলোচনা করে একটা দাম ঠিক করে নেয়। সেই দামেই পাইকাররা বাজার থেকে সবজি কিনে। সিন্ডিকেটের কারণে কেউ বেশি দাম বিক্রি করতে না পেরে অবশেষে লোকসান দিয়েই চাষিদের সবজি বিক্রি করতে হয়।

বাজার সিন্ডিকেটের কারণে স্থানীয় দরিদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগীরা। এ অবস্থা ভাঙতে না পারলে ধীরে ধীরে কৃষকরা সবজি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

সবজির হাটে কথা হয় ঢাকার কারওয়ান বাজারের পাইকারী সবজি ব্যবসায়ী কফিল উদ্দিন ও আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তারা বলেন, ন্যায্য মূল্য দিয়ে আমরা সবজি কিনে নিয়ে যাই। পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে বিক্রির সময় আমাদের বেশি লাভ থাকে না।

কৃষিবিদ মো. লতাফত হোসেন বলেন, নরসিংদীতে এবার শীতের সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। এ জেলার উৎপাদিত সবজি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সবজি চাহিদা পূরণসহ বিদেশেও রফতানির করছে।

দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত মধ্যস্বত্তভোগীদের কারণেই কৃষকরা নায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জন্য আইএফএমসি প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি কৃষদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য মূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলার ৪টি উপজেলা শিবপুর, মনোহরদী, বেলাবো ও রায়পুরায় প্রকল্পের কাজ চলছে। এতে দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং চাষিরাও ন্যায্য মূল্য পাবে।

এলবি/এএম/এসবি

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad