জয়পুরহাটে ক্ষেতে ‘পাতাপোড়া’ রোগের সংক্রমণ, ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

জয়পুরহাটে ক্ষেতে ‘পাতাপোড়া’ রোগের সংক্রমণ, ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি ৫:০৩ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০১৭

print
জয়পুরহাটে ক্ষেতে ‘পাতাপোড়া’ রোগের সংক্রমণ, ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা

চলতি ইরি-বোরো উৎপাদন মৌসুমে শস্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে খ্যাত জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ হাইব্রিড জাতের বোরো (ধান) ক্ষেতে ব্যাপক হারে ‘ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট’ বা (স্থানীয় ভাষায়) ‘পাতাপোড়া’ রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এছাড়াও কিছু কিছু বোরো ক্ষেতে দেখা দিয়েছে ব্লাস্ট রোগও। যদিও তা ‘পাতাপোড়া’ রোগের মত অত ব্যাপক নয়। সংশ্লিষ্ট কৃষকদের অভিযোগ আক্রান্ত ক্ষেতে একাধিকবার বালাই নাশক (ছত্রাকনাশক) ছড়িয়েও তেমন কাজ হচ্ছে না। দমন করা যাচ্ছে না ধান ক্ষেতের ওই ‘পাতাপোড়া’ রোগের সংক্রমণ। ধান পাকা শুরু হবার সময় ক্ষেতে এ ধরনের আকস্মিক সংক্রমণের কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

.

সরেজমিনে জেলার জয়পুরহাট সদর ও ক্ষেতলাল কালাই উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে ও কৃষকদের সাথে কথা বলে ধান ক্ষেতে ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট ও লিফ ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ সম্পর্কিত অভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। দুর থেকে আক্রান্ত বোরো ক্ষেত দেখলে মনে হয় যেন ক্ষেতের ধান পেকে গেছে। অথচ ক্ষেতের কাছে গিয়ে দেখা যায় শীষ কাঁচাই রয়েছে, পাকেনি। আবার কোনো কোনো ক্ষেতের পাতা পুড়ে যাওয়ার মত দেখা গেলেও প্রকৃত পক্ষে শীষে কোনো ধানই জন্মায়নি। আবার কোনো ক্ষেতে ধানের শীষ পুরোটাই চিটায় পরিণত হয়েছে। পাতা পুড়ে যাওয়ার এ ধরনের লক্ষণকে ধানের ‘পাতাপোড়া’ বা ‘বিএলবি’ এবং ক্ষেতে ধানের শীষ চিটা হয়ে যাওয়ার লক্ষণকে ‘ব্লাস্ট’ রোগ বলে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি অধিদফতর। ধান পাকা শুরু হবার সময়  বোরো ক্ষেতে এ ধরনের আকস্মিক পাতা পোড়া ও ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

জেলার অন্যতম আলু উৎপাদন এলাকা হিসেবে খ্যাত জয়পুরহাট সদরের একাংশ, কালাই এবং ক্ষেতলাল উপজেলার বিভিন্ন মাঠে ধান ক্ষেতে এই রোগ বেশি দেখা গেছে। ক্ষেতের রোগ দমনে এবার বোরো ধান উৎপাদনে বাড়তি অর্থ ব্যয় হলেও সে অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাবার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষকরা। তবে জেলা কৃষি অধিদফতরের দাবি, সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে কৃষি কর্মকর্তা কর্মচারীরা রোগ দমনে করণীয় বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে সচেতন করায় ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা কেটে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে জেলায় এবার ৭২ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে হাইব্রিড জাতের ধান। সরেজমিনে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আঁওড়া, নান্দাইল ও পুনট এলাকার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে আক্রান্ত ক্ষেতে কৃষককে বালাই নাশক (ছত্রাকনাশক) প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।

আক্রান্ত ক্ষেতে কৃষককে কীট নাশক প্রয়োগ করতে দেখা গেছে, কিন্তু প্রশ্ন করে সকলের মুখ থেকে প্রায় একই উত্তর পাওয়া গেছে যে, বারং বার ওষুধ ছিটিয়েও রোগ দমন হচ্ছে না।

জয়পুরহাট সদরের বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, ২৫ শতক জমিতে তিনি ‘কাটারিভোগ’ জাতের ধান চাষ করেছেন। ক্ষেতে রোগ দেখা দেয়ায় দুই বার ছত্রাকনাশক ওষুধ প্রয়োগ করেছেন।

এবার ধান ক্ষেতে পাতাপোড়া ব্যারাম খুব বেশি। কোনো বার ধানের ক্ষেতে এত বেশি রোগ দেখা যায়নি বরেও জানান তিনি। 

জেলার আলু প্রধান এলাকা কালাই উপজেলার মুলগ্রামের কৃষক আতাউর রহমান জানান, তিনি সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে ‘সাথী’ নামের হাইব্রিড বোরো ধান চাষ করেছেন। বর্তমানে ধান ক্ষেতে রোগ দেখা দিয়েছে। আড়াই হাজার টাকার ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও ক্ষেতের রোগ দমন হয়নি। পুরো ক্ষেত লাল হয়ে আছে।

শুধু তার নয়, পাশের আঁওড়া মাঠের অধিকাংশ ধান ক্ষেতেই এবার রোগের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ধানের ফলন অনেক কম হবে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

নান্দাইলদীঘি গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, রোপণের পর ফলন-২ হাইব্রিড জাতের ধানের পাতা পুড়ে গেছে। অন্যের দেখে খেতে এ পর্যন্ত তিনবার ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

ঘুরতে ঘুরতে নান্দাইল মাঠ এলাকায় সংবাদকর্মীদের সাথে দেখা হয় কালাই উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল কাশেম এর সাথে। তিনি জানান, ধানক্ষেতে পাতাপোড়া ও ব্লাস্ট রোগ দেখা দেওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আমরা মাঠে কাজ করছি। রোগ দমনে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। কৃষকরা সেই পরামর্শ কাজে লাগানোর ফলে বর্তমানে রোগ অনেকটা দমন হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সুধেন্দ্রনাথ রায় সংবাদ কর্মীদের বলেন, ‘অতিরিক্ত সারের ব্যবহার, গত মাসে একাধিকবার বয়ে যাওয়া কালবৈশাখি ঝড় ও বৃষ্টিসহ প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণেই তুলনামূলক ভাবে জেলায় এবার ধান ক্ষেতে পাতাপোড়া ও ব্লাস্ট রোগ বেশি হয়েছে।

ধান ক্ষেতের শতকরা ২৫ ভাগ পাতা মরে গেলেও ফলন কমবে না দাবি করে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৫ মে পর্যন্ত সাপ্তাহিক ও নৈমিত্তিক ছুটি বাতিল করে তাদের মাঠে নামানোর ফলে কৃষকরা উপকৃত হয়েছেন। আশা করি ফলন ভালই হবে।

এসএসএম/এসএফ

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad