ইটভাটার ধোঁয়া ও ব্লাস্ট রোগে হতাশায় গাজীপুরের কৃষক

ঢাকা, বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৫ আশ্বিন ১৪২৪

ইটভাটার ধোঁয়া ও ব্লাস্ট রোগে হতাশায় গাজীপুরের কৃষক

গাজীপুর প্রতিনিধি ৬:১৯ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০১৭

print
ইটভাটার ধোঁয়া ও ব্লাস্ট রোগে হতাশায় গাজীপুরের কৃষক

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় এবারের বোরো উৎপাদনে বাম্পার ফলন হয়েছে। বোরো ধানের বাম্পার ফলনে কৃষকদের চোখেমুখে আনন্দের কমতি নেই। তবে, কিছু কিছু এলাকায় অবৈধ ইটভাটার কালো ধোয়ার কারণে বোরো ধানে চিটা দেখা দেয়া এবং বেশ কয়েকটি এলাকার বোরো ধান ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দেওয়ায় ওই এলাকার চাষিরা চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন।

কয়েকটি এলাকায় সামান্য দুর্ঘটনা ঘটলেও পুরো উপজেলা বোরো ধানের উৎপাদন অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক গুণ ভাল হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ৯ ইউনিয়নের মধ্যে এবারের বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে ঢালজোড়া ইউনিয়নে।

কালিয়াকৈর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলার ১০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে ৪৫ হাজার ৬০০ জন কৃষক বোরো ধানের চাষ করেছেন। উপজেলার কৃষি অফিসের এ বছরে বোরো ধানের উৎপাদন টার্গেট হাইব্রিড জাতের ২ হাজার ২৮০ মেট্রিক টন, উফসী জাতের ৫৯ হাজার ৩১৮.৫৫ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় জাতের ২৫৫ মেট্রিক টন।

এবারের বোরো ধানের ফলন ভাল হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ফলন পাওয়া যাবে। আর একারণে কৃষকদের মধ্যে আনন্দের শেষ নেই। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ঢালজোড়া ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় এবারের বোরো ধানের উৎপাদন সবচেয়ে ভাল হয়েছে। এ ইউনিয়নের ১৪ হাজারের চেয়ে বেশি কৃষক ১ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন।

এবছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও উপজেলার বেগুনবাড়ি ও কান্দাপাড়া এলাকায় ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুড়ে গেছে ১০ হেক্টর জমির বোরো ধান। অসহায় কৃষকেরা ছুটছেন ভাটা মালিক আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে। এছাড়াও উপজেলার ফুলবাড়িয়া,মৌচাক এবং আটাবহ ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকার বোরো ধান ক্ষেত ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী ৩ টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেড় শতাধিক কৃষক। এ রোগে আক্রান্ত জমির কৃষকরা ফলনের লক্ষ্য মাত্রাতো দূরের কথা তারা কোন ফলনই ঘরে তুলতে পারেনি।

সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার শাহবাজপুর ও কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষকরা সফলভাবে বোরো ধান চাষ করে। কৃষকদের চোখে-মুখে স্বপ্ন ছিল বাম্পার ফলনের। ধানের যথারীতি ফুল বের হয়েছে। ধান দেখে হাসিখুশি কৃষকরা। হঠাত ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফুলন্ত ধান পুড়ে যায়। ধোঁয়ার নিশানা যতদূর পর্যন্ত গেছে ততদূর পর্যন্ত বোরো ধান বিনষ্ট হয়েছে। তাতে ১০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফুলন্ত বোরো ধান পুড়ে যাওয়ায় কৃষকের চোখেমুখে অন্ধকার নেমে আসে। অধিকাংশ জমির একমুঠো ধানও ঘরে উঠবে না।

তথ্য সংগ্রহকালে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান,প্রতি বিঘা জমি চাষ করতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ মণ বোরো ধান উৎপাদন হয়। কিন্তু অবৈধভাবে গড়ে উঠা বেশ কয়েকটি ইটভাটার কারণে ৩ বছর যাবত  কোন ধান ঘরে নিতে পারছেন না কৃষকেরা।

আইনকে তোয়াক্কা না করে প্রতি বছরই বাড়ছে ইটভাটা । এর মধ্যে অবৈধভাবে কৃষি জমির উপর গড়ে উঠা মেসার্স আর,বি,এফ ইটভাটার মালিক পক্ষ থেকে গত বছর ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ বিঘা প্রতি  ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা প্রদান করে বলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে জানা যায়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এবছর আর কোন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না বলে ভাটা মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত  কৃষকদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

কান্দাপাড়া গ্রামের অসহায় কৃষক ভজন চন্দ্র দাস বলেন, অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়ায় আমার ২০ শতাংশ জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ  পুড়ে গেছে। গত বছর কিছু টাকা দিলেও এবছর আর কোন ক্ষতিপূরণ দিবে না বলে ভাটা মালিকের পক্ষ থেকে আমাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা কোন ক্ষতিপূরণ চাই না। আমরা আমাদের জমিতে ভালভাবে চাষাবাদ করতে চাই। তিনি  অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানান।

কৃষক শশী মোহন দাস বলেন, আমার ১০০ শতাংশ জমির ধানসহ অবৈধ ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় অত্র এলাকার ১০ হেক্টরেরও বেশি জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। জমি থেকে খ্যার (খড়) ছাড়া  আর কিছু মিলবে না। কৃষি জমির উপর অবৈধভাবে গড়ে উঠা  ইটভাটা বন্ধ করে তাদের সুষ্ঠুভাবে চাষাবাদের সুযোগ দেয়ার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

অসহায় কৃষাণী আশা রানী দাস বলেন, অবৈধ ইটভাটার কারণে ৩বছর যাবৎ আমাদের জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। অথচ প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। জমিতে যদি ধানই ফলাতে না পারি ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে দেশের কোন সুফল আসবে কি বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এদিকে অভিযুক্ত ইটভাটার মালিকরা দাবী করেছেন, ভাটার কারণে বোরোধানের কোন ক্ষতি হয়নি। বরং অন্যকোন রোগের কারণের ধান নষ্ট হতে পারে।

কালিয়াকৈর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, এবারের বাম্পার ফলনে কৃষকদের চোখেমুখে অন্যান্য বছরের চেয়ে হাসি দেখা যাচ্ছে। এবছর বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে আশা করছি। ৩ টি ইউনিয়নের ১৮ হেক্টর জমিতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়ার ১১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে, ব্রি-ধান ২৮ চাষ করার কারণে ওইসব এলাকায় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে অন্তত এক বছর পর পর যেন এ ধানের চাষ করে। তাহলে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জমি ইতিমধ্যেই পরিদর্শন করেছি। আইনগত ভাবে কৃষি জমির উপর ইটভাটা নির্মাণের কোন সুযোগ নাই। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান ও কৃষি জমির উপর অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাটা বন্ধের দাবী জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি আমি ক্ষতিয়ে দেখবো। তদন্তে প্রমাণ পেলে কৃষি জমি রক্ষায় দায়ী ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেএ/জেআই

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad