খাদ্য বিভাগের অনন্য দৃষ্টান্ত  কাজী সাইফুদ্দিন

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০১৭ | ৮ ভাদ্র ১৪২৪

খাদ্য বিভাগের অনন্য দৃষ্টান্ত  কাজী সাইফুদ্দিন

নীলফামারী প্রতিনিধি ৪:০৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০১৭

print
খাদ্য বিভাগের অনন্য দৃষ্টান্ত  কাজী সাইফুদ্দিন

‘আমি সরকারী অফিসার, আমি এ কালের জমিদার’ হায়দার হোসেনের গাওয়া এই গানটি বহুলাংশে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের দোর গোরায় সরকারী সেবা পৌঁছে দিয়ে এই ভুলটি প্রমাণ করেছের নীলফামারীর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন। তিনি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের কাছে ছুটে গিয়েছেন। তাদেরকে বুঝিয়েছেন খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতে হলে ফুড গ্রেইন লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স ব্যতীত ব্যবসা করা অন্যায়। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।  শুনেছেন তাদের কথা। ব্যবসায়ীরা তুলে ধরেছের বিভিন্ন শর্তের বেড়াজাল ও হয়রানিসহ নানা সমস্যার কথা। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সমস্যা চিহিৃত করে তার সমাধানে কাজ করেছেন। ফলশ্রুতিতে এসেছে সফলতা। ডোমার উপজেলার শতভাগ খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী এখন ফুড গ্রেইন লাইসেন্স গ্রহণ করে বৈধ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রাম ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন নতুন আইডিয়ার মাধ্যমে সহজে কম খরচে দ্রুততম সময়ে সেবা  জনগণের দোর গোরায় পৌঁছে দেয়া। আর এই কাজটি করেছেন নীলফামারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন।

‘নাগরিক সেবায় উদ্ভাবন’ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি প্রকল্প হাতে নেন। লাইসেন্স প্রথা সহজীকরণের মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে, কম খরচে কিভাবে সেবা জনগণের দোর গোরায় পৌঁছে দেয়া যায় তার লক্ষে তিনি কাজ শুরু করেন। নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ীদের ফুডগ্রেইন লাইসেন্সে এর আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে তিনি ‘খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। শুরুতেই তিনি চিন্তায় পড়ে যান প্রকল্পটি সফলভাবে সমাপ্ত করতে পারবেন কিনা তা ভেবে। যে ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স নিতে অস্বীকার করেন তাদেরকে লাইসেন্স এর আওতা আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখায় দেয়। কিন্ত কঠিন কাজটিকে সহজ করে ব্যবসায়ীদের মন জয় করে সকলকে লাইসেন্স এর আওতায় নিয়ে আসতে হবে এই সংকল্পে অটুট থাকেন তিনি।

শুরু হয় তার পরিকল্পনা। ধাপে ধাপে কিভাবে প্রকল্পটি সফল করা যায় তার ছক আঁকেন। মহা-পরিচালক খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে তিনি লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোমর বেধে নামেন। শুরুতেই টিম গঠন করে একটি সভা করেন। এর পর একে একে লাইসেন্সযোগ্য খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ীদের একটি তালিক প্রণয়ন করেন। তালিকা তৈরির পর এটি ধরে ধরে বিভিন্নভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নিতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। লাইসেন্স গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে পত্র প্রেরণ, মোবাইলে এসএমএস প্রদান, ওয়ের পোর্টালে লাইসেন্স এর আবেদন ফরম, এ সংক্রান্ত এসআরও, লাইসেন্স ফিস জমা প্রদান করার কোড আপলোড, ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময়, মাইকিং, লিফলেট, হ্যান্ডআউট, ডিজিটাল ব্যানার তৈরিসহ নানাভাবে প্রচার প্রচারণার মধ্য দিয়ে প্রকল্পের সফলতা আসে।

ডোমার উপজেলার খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী সফিয়ার রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত ফিস ব্যাংকে জমা দেয়ার পর চালানের কপিসহ আবেদন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে জমা দেয়ার পরদিন আমার মোবাইলে এসএমএস আসে আপনার লাইসেন্স প্রস্তুত হয়েছে। এসএমএস পেয়ে আমি অবাক হয়ে যাই। কোনো হয়রানি ছাড়া এত কম সময়ে লাইসেন্স পাব এটি কল্পনার বাইরে ছিল। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সার্বিক প্রচেষ্টায় এই অসাধ্য সাধন হয়েছে।

তিনি বলেন, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি মনে করি লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নকালে ১৫% মূসক রহিত করা, নবায়ন করার মেয়াদ শেষে অল্প বিলম্ব ফিস প্রদানের মাধ্যমে পরবর্তী ০৬ মাস পর্যন্ত নবায়ন করার সুযোগ রাখা এবং লাইসেন্স ফিস আরেকটু কমালে সকলেই লাইসেন্স গ্রহণ করবে। তখন আর কারো কোন আপত্তি থাকবে না।

সফিয়ার রহমানের সাথে সুর মিলয়ে একই কথা বলেন খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী মো. নূরনবী, সন্তোষ কুমার আগরওয়ালা, কালিপদ সাহা, আফছারুল হক। তারা সবাই বলেন, খাদ্যশস্য লাইসেন্স এর বিষয়টি যে এত গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের আগে জানা ছিল না। বর্তমান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মহোদয় লাইসেন্স গ্রহণ করার জন্য  আবেদন ফরম,  চালান  নম্বর, লাইসেন্স গ্রহণ সংক্রান্ত সরকারি আদেশসহ যা যা প্রয়োজন সবকিছু চিঠি দিয়ে আমাদের সরবরাহ করেছেন। তিনি ও উপজেলার অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ আমাদের এসএমএস প্রদান করে ও ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কাছে এসে লাইসেন্স গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছেন। সরকারী ফিস জমা দেয়ার পর খাদ্য কর্মকর্তারাই আমাদের এসএমএস দিয়ে জানিয়েছেন লাইসেন্স প্রন্তুত হয়েছে। আমাদের যোগাযোগ করতে দেরী হলে তারাই বাহক মারফত আমাদের ঠিকানায় লাইসেন্স পাঠিয়ে দিয়েছেন। কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই আমরা লাইসেন্স পেয়েছি। লাইসেন্স প্রদান সহজ করার মাধ্যমে খাদ্য বিভাগ যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে আমরা ব্যবসায়ীরা খুব খুশি। খাদ্য বিভাগ সম্পর্কে মানুষের যে নেতিবাচক ধারনা ছিল  বর্তমান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মহোদয় তা ভেঙে দিয়ে ইতিবাচক ধারনা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও প্রকল্পের টিম লিডার কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, আমি সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। শুরুতে কাজটি বেশ কঠিনই ছিল। লাইসেন্স গ্রহণে ব্যবসায়ীদের অনীহা ছিল। তারা আমাদের বলেন, আমদের ট্রেড লাইসেন্স, কৃষি পণ্য লাইসেন্সসহ বিভিন্ন লাইসেন্স গ্রহণ করতে হয়। আবার ফুড গ্রেইন লাইসেন্স কেন নিতে হবে। কিন্তু ফুড গ্রেইন লাইসেন্স ছাড়া  ব্যবসা করা যে দণ্ডনীয় অপরাধ তা তাদের জানা ছিল না। বিষয়টি অনেকে ঠিকভাবে বুঝতেনওনা। কেউ কেউ আাবার বিভিন্ন শর্তের বেড়াজাল ও হয়রানিকে লাইসেন্স গ্রহণ না করার জন্য দায়ী করেন। আমি ও আমার টিমের প্রতিটি সদস্য তাদেরকে বিষয়টি ভালভাবে বুঝিয়েছি। আমরা বলেছি আমাদের কাছে আপনাদের আসতে হবে না। আমরা আপনাদের কাছে গিয়ে লাইসেন্স দিয়ে আসব। 

যখন আমরা তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে লাইসেন্স দিতে শুরু করলাম তখন তারা বুঝতে শুরু করলেন। লাইসেন্স ফিস সরকারী কোষাগারে জমা দেয়ার সাথে সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা লাইসেন্স প্রস্তুত করেছি। প্রস্তুত করার পর এসএমএস প্রদান করে জানিয়ে দিয়েছি আপনার লাইসেন্স প্রস্তুত। ব্যবসায়ীরা অনেকে এসে সাথে সাসে লাইসেন্স নিয়ে গেছেন। যারা আসতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন তদেরকে ডাকযোগে আবার কখনো কখনো বিশেষ বাহক মারফৎ লাইসেন্স পৌঁছে দিয়েছি। প্রকল্পটি সফলভাবে সমাপ্ত করার জন্য এর সঙ্গে  জড়িত সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কাজটি করতে গিয়ে আমরা যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে এভাবে কাজ করার পাশাপাশি  লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নকালে যে ১৫% মূসক প্রদান করতে হয় তা বাদ  দেয়া, নবায়ন করার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও পরবর্তী ০৬ মাস পর্যন্ত বিলম্ব ফিস নির্ধারণ করে নবায়ন করার বিধান রাখা এবং কেউ লাইসেন্স গ্রহণ না করলে জরিমানা করার বিধান রেখে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের জরিমানা করার ক্ষমতা অর্পণ করা হলে  প্রকল্পটি খুব সহজেই সারাদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

এনএ/এসএফ

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad