পুঁজিবাজারে হতাশা কাটিয়ে উত্থানে রেকর্ডের বছর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ১৩ বৈশাখ ১৪২৫

পুঁজিবাজারে হতাশা কাটিয়ে উত্থানে রেকর্ডের বছর

জাহিদ সুজন ১:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭

print
পুঁজিবাজারে হতাশা কাটিয়ে উত্থানে রেকর্ডের বছর

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরো একটি বছর। চলতি বছরে লেনদেন, মূল্যসূচক এবং বাজারমূলধনসহ সকল ক্ষেত্রে সাফল্যের মাইলফলক ছুঁয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ২০১০ সালের ভয়াবহ ধস পরবর্তী সময়ে এবারই ইতিবাচক ধারায় বছর পার করলেন বিনিয়োগকারীরা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা থাকায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো করেছে পর্যাপ্ত মুনাফা। যার ধারাবাহিকতায় বছরান্তে ডিভিডেন্ডও ঘোষণা করেছে কোম্পানিগুলো। ফলে পুরাতন বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি চলতি বছরে সম্পৃক্ত হয়েছে নতুন বিনিয়োগকারীরাও।

বিদায়ী বছরের অর্জন সম্পর্কে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ২০১৭ সালে দেশের পুঁজিবাজার এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে৷ নতুন বছরে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে পুঁজিবাজার টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে সামনে এগিয়ে নেওয়াই হবে মূল লক্ষ্য৷ এই অগ্রসরমান বাজারের গতিশীলতা ধরে রাখতে এবং সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অর্থায়নের ঘাটতি মোকাবেলায় সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে৷ সে লক্ষ্যে দেশের পুঁজিবাজার হতে পারে উন্নয়ন লক্ষ্যমাএা অর্জনের একটি বড় মাধ্যম।

তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ অবকাঠামো খাত উন্নয়নে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাচ্ছে৷ বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে অর্থনীতির নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করা সম্ভব৷ ২০১৭ সালে দু’একবার সাময়িক দরপতন বাদ দিলে সারা বছরই গতিশীলতার মধ্যেই কেটেছে দেশের পুঁজিবাজার। এ সময় বাজারের লেনদেন, মূল্যসূচক এবং বাজারমূলধনসহ সবদিক থেকেই রেকর্ড করে নতুন উচ্চতায় অবস্থান করে৷

লেনদেনের উল্লম্ফনে শেষ ২০১৭

২০১৬ সালের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত বছরে অর্থাৎ ২০১৭ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক লেনদেন বেড়েছে ৮২.০৮ শতাংশ বা ৯৭,৮০২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৯৫৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা৷

এদিকে, ২০১৬ সালে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ১৫৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অস্বাভাবিক মার্কেট ২০১০ সাল বাদ দিলে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ লেনদেন৷

বিদায়ী বছরের ২৪৮ কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৮৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা৷ অপরদিকে ২০১৬ সালে ২৪১ কার্যদিবসে গড়ে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৯৪ কোটি ৪৩ কোটি টাকা৷

রেকর্ড গড়েছে ডিএসইর প্রত্যেকটি মূল্যসূচক

পুঁজিবাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো সূচক৷ ২০১৭ সালে রেকর্ড গড়েছে ডিএসই’র তিনটি সূচকই।

ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ১২০৮.৪৭ পয়েন্ট বা ২৪.০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬২৪৪.৫২ পয়েন্টে উন্নীত হয়৷ ২০১৭ সালে ডিএসইএক্স মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ৬৩৩৬.৮৮ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৫,০৮৩.৮৯ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ৪,০৯০.৪৭ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷ এ সূচক চালু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ৷

২০১৬ সালের তুলনায় ডিএস ৩০ সূচক (ডিএস-৩০) ৪৭২.৩১ পয়েন্ট বা ২৬.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২৮৩.২৩ পয়েন্টে উন্নিত হয়৷ ২০১৭ সালে ডিএস-৩০ মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ২২৯০.৩৫ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১৮২১.৮৯ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ১৪৭৩.০১ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷ এ সূচক চালু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ৷

২০১৭ সালে শরীয়াহ সূচক (ডিএসইএস) ১৯৮.৮০ পয়েন্ট বা ১৬.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৯০.৬৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়৷ ২০১৭ (ডিএসইএস) মূল্যসূচক সর্বোচ্চ ১৩৯৪.২৬ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১২০০.৫৩ পয়েন্ট৷ ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি ৯৪১.২৮ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়৷ এ সূচক চালু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ৷

বাজার মূলধনে নতুন রেকর্ড

সূচকের পাশাপাশি ডিএসই’র বাজার মূলধনও ইতিহাসের এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে৷ ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ৮১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বা ২৩.৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে৷ ২০১৭ সালে বাজার মূলধন সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি৷

আইপিও’র অর্থ উত্তোলন কমেছে

২০১৭ সালে বাজার থেকে একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ মোট ৭টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে একটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে। অপরদিকে ২০১৬ সালে ৩টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ মোট ১১টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে মোট ৮৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছিল৷ এর মধ্যে ২টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৩৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন উওোলন করেছিল।

রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বেড়েছে

২০১৭ সালে ৪টি কোম্পানি ৮৬ কোটি ৮০ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ১,১১৪ কোটি ২ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ৩টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৪৬ কোটি ০২ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে৷ আগের বছর ৩টি কোম্পানি ২৭ কোটি ৩৮ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেছিল ৩৬৫ কোটি ৮২ লাখ কোটি টাকা৷ এর মধ্যে ২টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ মূলধন উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ০২ লাখ টাকা।

বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধি

২০১৭ সালে ব্যাংকিং খাতের ১৭টি, আর্থিক খাতের ১০টি, প্রকৌশল খাতের ২২টি, খাদ্য ও আনুসাঙ্গিক খাতের ৫টি, জ্বালানি ও বিদ্যুত খাতের ৫টি, জুট খাতের ১টি, টেক্সটাইল খাতের ২৪টি, ওষুধ ও রসায়ন খাতের ১২টি, সেবা ও আবসনা খাতের ২টি, সিমেন্ট খাতের ১টি, আইটি খাতের ৪টি, চামড়া খাতের ২টি সিরামিক খাতের ৩টি, বিমা খাতের ২৫টি এবং বিবিধ খাতের ৭টিসহ মোট ১৪২টি কোম্পানি ২৭৯ কোটি ২৯ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২ হাজার ৮০৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে৷

অপরদিকে ২০১৬ সালে মোট ১২৬টি কোম্পানি ২৫০ কোটি ৮০ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২,৫০৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে৷

মার্কেট পিই

২০১৭ সালের শেষ দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজসমূহের মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই দাঁড়ায় ১৬.৭৮৷ অপরদিকে ২০১৬ সালের শেষ দিনে মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ১৪.২৯৷

খাতওয়ারি মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মার্কেট পিই ৮.৪১, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১১.০৯, ব্যাংকিং খাতের মার্কেট পিই ১১.১৬, বিমা খাতের মার্কেট পিই ১৪.৫০ এবং টেক্সটাইল খাতের মার্কেট পিই ১৬.৭৬৷ সামগ্রিক বাজার মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ১৬.৭৮৷

মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত

২০১৭ সালের শেষে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজসমূহের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত দাঁড়ায় ২১.৬২ শতাংশ, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম৷ যেমন: থাইল্যান্ড (এসইটি) মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত ১১০.৩৩ শতাংশ, ইন্ডিয়া (বিএসই) ৮৬.৩৪ শতাংশ, পাকিস্তান (কেএসই) ২৮.২৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা (সিএসই) ২৩.৬৮ শতাংশ, নেপাল (এনইপিএসই) ৭০.০১ শতাংশ এবং মালোয়শিয়া (বুরসা মালোয়শিয়া) ১৪২.২৪৷ মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধির জন্য ভালো মৌল ভিওি সম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তি বড়ানো জরুরি৷

বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বেড়েছে

২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগের বছরের তুলনায় ২ হাজার ৬৭৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বেশি লেনদেন করেছেন, যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে৷

২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা ডিএসই’র মোট লেনদেনের ৫.২৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে ক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৭৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং বিক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা৷

অপরদিকে, ২০১৬ সালে বৈদেশিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা৷ এর মধ্যে ক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ০৫৭  কোটি ৪ লাখ টাকা এবং বিক্রয়কৃত সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা৷ ২০১৭ সালে নিট অবস্থান দাঁড়ায় ১,৭০৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা বা ২৭.১৬ শতাংশ বেশি৷

ওটিসি মার্কেটেও লেনদেনের উল্লম্ফন

ওটিসি মার্কেটের লেনদেনও আগের বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে ১৭১৬.১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ এই বছরে ওটিসি মার্কেটে মোট ১০৮ লাখ ৮৫ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়৷ যার মূল্য ৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা৷ অপরদিকে গত বছরে শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৩ লাখ ২৫ হাজার৷ যার মূল্য ছিল ৪ কোটি টাকা৷

জেডএস/আইএম

 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad