গ্যাং কালচারে তারুণ্য ক্ষয়ের বছর

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫

গ্যাং কালচারে তারুণ্য ক্ষয়ের বছর

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭

গ্যাং কালচারে তারুণ্য ক্ষয়ের বছর

গ্যাং কালচার আর সিনিয়র জুনিয়র দ্বন্দ্ব নিয়ে দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে উঠতি কিশোরেরা। তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, তা বিদায়ী বছরে সারা দেশের মানুষ দেখেছে।

বছরটিতে পার্টি করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, মাদক সেবন থেকে শুরু করে খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে কিশোরদের।

বছরের শুরুতেই একদল কিশোরের গ্যাংওয়ারে প্রাণ হারান উত্তরা ট্রাস্ট কলেজের ছাত্র আদনান কবির। একই রকম ঘটনায় বছরটিতে আরো কয়েকজন কিশোর নিহত হন।

কিশোরদের গ্যাং কালচারে উত্তরায় প্রাণ যায় স্কুলছাত্র আদনানের। ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় একদল কিশোর উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে উত্তরার ১৩ নং সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। এসব কিশোর এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, আদনানকে হত্যার জন্য বের হওয়ার আগে তারা ফেসবুকে গ্রুপ ছবি পোস্ট করে যায়।

আদনান হত্যার আসামিদের গ্রেফতারের পর কিছুদিন দমে থাকলেও আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে ফেসবুকে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠে কিশোর গ্যাংস্টাররা। ‘ডিসকো আসছে উত্তরা কাঁপছে’, ‘উত্তরায় শুধু নাইন স্টার চলে ভাই’ এই ধরনের স্লোগানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফের সরব হয়ে উঠে তারা।

ফেসবুক পেজে অস্ত্রের ছবি দিয়ে, পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধামকি দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিতে চাইছে এই কিশোরেরা।

ফেসবুকে ডিসকো বয়েজের পেইজে গত ২৬ অক্টোবর মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে বিশাল শোডাউনের একটি ছবিকে কভার ফটো দেওয়া হয়, যার ক্যাপশন ছিল ‘ডিসকো আসছে, উত্তরা কাঁপছে’। পেইজটির সার্ভিস ডিটেইলসে লেখা- ‘মার্ডার’, রেট: ১০ লাখ। ২ অক্টোবর ওই পেইজে একটি ছবি আপলোড করা হয়েছে, যাতে লেখা ‘গেনজাম_ নেশা- পেশা-ভালবাসা।’

এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমের নাম হ্যাশট্যাগ দিয়ে একটি ছবি পোস্ট করে ডিসকো বয়েজ। তাতে লেখা ছিল, যেখানে প্রশাসন চুপ, টাকার বিনিময়ে কেনা যায় পুলিশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আসে না কেউ, সেখানে আমরা বাধ্য হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে হয়ে যায় দোষ?

অন্যদিকে বিরোধী কিশোর গ্রুপ নাইন স্টারের পেইজে অক্টোবরের ২৪ তারিখে দেওয়া একটি পোস্ট ছিল আরো ভয়ঙ্কর। সেখানে ধারালো ছুরি, কুড়াল, হাতুড়ি, বেসবল ব্যাটসহ বিভিন্ন অস্ত্রের তিনটি ছবি দিয়ে হ্যাশট্যাগ ছিল যন্ত্রপাতি।

এমনই দুই কিশোর গ্রুপের সিনিয়র জুনিয়র দ্বন্দ্বে ১৯ মে যাত্রাবাড়ী কাজলা পেট্রলপাম্প ছনটেক এলাকায় প্রাণ যায় জাহিদুল ইসলামের (১৫)। আর ফেসবুক মেসেঞ্জারে ঝগড়া থেকে ৬ অক্টোবর কদমতলীর রায়েরবাগ এলাকায় ছুরিকাঘাতে খুন হন রফিকুল ইসলাম শিপন (১৮)।

ঘুমন্ত সহপাঠীকে গলাকেটে হত্যা
রাত তখন দুইটা। গুলিস্তানের মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসার মেঝেতে ঢালাওভাবে পাতা বিছানায় ঘুমাচ্ছিল ৪০ শিক্ষার্থী। এমন সময় ১২ বছরের আব্দুর রহমান জিদানের ওপর ফল কাটার ছুরি হাতে চেপে বসে ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবু বক্কর। ধস্তাধস্তিতে তাদের মধ্যে দু’জনের ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু ভয়ে তারা ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকে।

দুই শিক্ষার্থী দেখতে পায় বক্কর হাতে থাকা ধারালো ওই ছুরি দিয়ে জিদানকে গলাকেটে হত্যা করে। এরপর মরদেহ টেনে নিয়ে গিয়ে মাদ্রাসার সেপটিক ট্যাংকে ফেলে পালিয়ে যায়। রোমহর্ষক ওই ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২০ নভেম্বর।

এসব আলোচিত ঘটনা ছাড়াও বিদায়ী বছরে ঘটেছে নানা কিশোর অপরাধ। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জের ধরে গত ১ জুলাই রাতে রাজধানীর আদাবরে সজল (১৬) নামের এক কিশোরকে পিটিয়ে এবং মাথায় আঘাত করে হত্যা করেছে একদল কিশোর। হত্যাকারীদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা মাদকসেবী। ছিনতাই-চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত তারা।

গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরে স্কুল শিক্ষার্থী অমিয়কে (১৩) তাজমহল রোডের ঈদগাহে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে জখম করে একদল বখাটে কিশোর। অমিয়র বাবা কবি আহমদ স্বপন মাহমুদ ওই রাতেই মোহাম্মদপুর থানায় লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন। আহত অমিয় ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।

আর ১৭ জুলাই বংশালে সহপাঠী কিশোরের হাতে খুন হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী জুনায়েদ আল হাবিব (১৫)।

পিএসএস/আইএম