আব্দুল জব্বার নেই, তবু যেন দীপ নেভে নাই

ঢাকা, সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪

আব্দুল জব্বার নেই, তবু যেন দীপ নেভে নাই

মাসুম আওয়াল ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭

print
আব্দুল জব্বার নেই, তবু যেন দীপ নেভে নাই

হিম ঝরা শীতের হিমেল বাতাসে উড়েই চলেছে গর্বের লাল সবুজ পতাকা। টিভির রিমোট চাপলেই দেখা মিলছে— সালাম সালাম হাজার সালাম, লাখো শহীদ স্মরণে। হয়ত আরো দীর্ঘদিন চলবে এই গান। শুধু নেই অমর এই গানের শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার।

কালের পরিক্রয়ায় নতুন ইংরেজি বছর সমাগত। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বিদায় নিচ্ছে ২০১৭। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উৎরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী ছিল বিদায়ী ২০১৭ সাল।

এ বছর আমরা হারিয়েছি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারকে। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘ওরে নীল দরিয়া’সহ বিখ্যাত অনেক গানের শিল্পী ৩০ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

দুটো কিডনিই অকেজো হয়ে গিয়েছিল এই গুণী শিল্পীর। কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু, সেই সময়টুকুও আর মেলেনি। তার আগেই বিদায় নেন আব্দুল জব্বার।

কে এই আব্দুল জব্বার?

আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তাঁর গান গাওয়া শুরু। তিনি ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এর গানে কণ্ঠ দেন তিনি।

সিনেমার গান গেয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা

১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সত্য সাহার সুরে আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পায় ‘তুমি কি দেখেছ কভু, জীবনের পরাজয়’ গানটি। ১৯৬৮ সালে ‘পিচ ঢালা পথ’ ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’ এবং ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে ‘সুচরিতা যেও নাকো আর কিছুক্ষণ থাকো’ গানে কণ্ঠ দেন।

১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বরেণ্য এ শিল্পী অনেক ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও প্রেরণা জোগাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অসংখ্য গানে কণ্ঠ দেন। তার গানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

মূলত কণ্ঠই ছিল তার যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার। যুদ্ধের সময় তিনি প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরির কাজ করেন। তখন কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ঘুরে প্রেরণা জোগাতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি।

সে সময় গণসংগীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি আব্দুল জব্বার স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান দিয়েছিলেন।

গানের জন্য সম্মাননা

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক (১৯৭৩), একুশে পদক (১৯৮০), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬), বাচসাস পুরস্কার (২০০৩), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস-আজীবন সম্মাননা (২০১১) ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার।

চিরবিদায়

আগস্টের ৩১ তারিখ শেষ বিদায় জানানো হয় আব্দুল জব্বারকে। ওইদিন সকালে শিল্পীর মরদেহ বারডেমের হিমঘর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। সেখানে নাগরিক শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ কণ্ঠসৈনিককে প্রদান করা হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বাংলাদেশ নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যে মুখগুলো সামনে ভেসে ওঠে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আব্দুল জব্বারও থাকবেন তাদের মাঝে। তার গাওয়া একটা গানের মতোই আমাদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আব্দুল জব্বার— ‘দীপ নেভে নাই’।

এএ/আইএম

 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad